নভেম্বর 30, 2022
শুধু খরচই বেড়েছে, সেবার মান বাড়েনি

শুধু খরচই বেড়েছে, সেবার মান বাড়েনি

নানা সমস্যায় জর্জরিত পর্যটকের পছন্দের শীর্ষে থাকা দুই গন্তব্য কক্সবাজার ও সিলেট।

বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজারে তিন বছর আগে মাঝারি মানের হোটেলে একটি কক্ষের এক দিনের ভাড়া ছিল ৮০০ টাকা। এখন সেই কক্ষের ভাড়া গুনতে হচ্ছে দেড় হাজার টাকা। একইভাবে দেড় হাজার টাকার শীতাতপনিয়ন্ত্রিত (এসি) কক্ষের ভাড়া এখন ২ হাজার ২০০ থেকে আড়াই হাজার টাকা।

হোটেলকক্ষের পাশাপাশি রেস্তোরাঁর খাবারের দাম, এমনকি ঢাকাসহ বিভিন্ন গন্তব্য থেকে বাস কিংবা উড়োজাহাজে কক্সবাজারে যাওয়া আসার ভাড়াও বেড়েছে। এতে পর্যটকদের খরচ অনেক বেড়েছে।

তবে সেবার মানের কোনো উন্নতি হয়নি। ১২০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের সৈকতের মাত্র পাঁচ কিলোমিটারে ভিড় করেন পর্যটকেরা। সেটুকুও আবার ভাঙাচোরা। বাকি সৈকতে পর্যটকদের নিরাপত্তায় নেই কোনো সুযোগ–সুবিধা। সন্ধ্যার পর সৈকতে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন পর্যটকেরা। আছে বিদ্যুৎ–বিভ্রাটের যন্ত্রণাও।

একই অবস্থা দেশীয় পর্যটকদের দ্বিতীয় শীর্ষ গন্তব্য সিলেটেও। থাকা, খাওয়া ও পরিবহন খরচ বাড়লেও জাফলং, রাতারগুল, বিছনাকান্দির মতো দর্শনীয় স্থানে ভ্রমণে গেলে নানামুখী সমস্যায় পড়তে হয় পর্যটকদের। নারী-শিশুদের জন্য নেই মানসম্মত কোনো শৌচাগার। অধিকাংশ দর্শনীয় স্থানেই খাবারের ভালো কোনো রেস্তোরাঁ নেই। আবার পর্যটকদের নিরাপত্তার সমস্যাও আছে এসব স্থানে।

জানতে চাইলে ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (টোয়াব) সভাপতি মো. রাফেউজ্জামান গত রাতে প্রথম আলোকে বলেন, পর্যটনশিল্পের ৬০ শতাংশ সুযোগ-সুবিধা অদৃশ্যমান। বাকি ৪০ শতাংশ দৃশ্যমান, যা হোটেল-মোটেল, রেস্তোরাঁ, রাস্তাঘাট, পরিবহনব্যবস্থা, বিনোদন ইত্যাদি। কোনো দর্শনীয় স্থানে পর্যটকেরা যদি প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা না পান, তাহলে সেটি টিকবে না। তিনি আরও বলেন, দেশে পর্যটনশিল্পের ধীরে ধীরে উন্নতি হচ্ছে। এই শিল্পের সম্ভাবনাকে দ্রুত কাজে লাগাতে হলে সরকারের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পর্যটনবান্ধব হতে হবে।

বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকতে বছরে অন্তত ৩০ লাখ পর্যটক ভ্রমণ করেন। একজন পর্যটক দুই রাত, তিন দিন কক্সবাজারে অবস্থান করলে হোটেলভাড়া, খাওয়াদাওয়াসহ খরচ হয় গড়ে ১০ হাজার টাকা। সে হিসাবে ৩০ লাখ পর্যটক বছরে কক্সবাজারে খরচ করেন ৩০০ কোটি টাকার বেশি।

কক্সবাজার শহরে পর্যটকদের জন্য রয়েছে পাঁচ শতাধিক রেস্তোরাঁ। তিন বছর আগে মাঝারি মানের রেস্তোরাঁয় ২০০ টাকায় মাছ অথবা মাংস দিয়ে এক বেলা খাওয়া যেত। এখন সেই খরচ বেড়ে হয়েছে ৩০০ থেকে ৩২০ টাকা। আবার কক্সবাজার থেকে ঢাকায় যাওয়ার শীতাতপনিয়ন্ত্রিত (এসি) বাসের ভাড়াও বেড়েছে ১০০ থেকে ৪০০ টাকা। বর্তমানে এসি বাসের একেকটি আসনের ভাড়া এক হাজার থেকে আড়াই হাজার টাকা।

কক্সবাজার রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক রাশেদুল ইসলাম বলেন, বাজারে মাছ, মাংস, সবজিসহ নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে। তা ছাড়া কক্সবাজারে গ্যাসলাইন নেই। রান্না হয় এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডারে। তাতেও খরচ বেড়ে যায়। আগে মাছ কিংবা মাংসের সঙ্গে কয়েক ধরনের ভাজি, ভর্তা, ডাল খেলেও ৫০০ টাকা খরচ হতো না। এখন সেই খরচ ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বেড়েছে।

অন্যদিকে কক্সবাজার হোটেল গেস্টহাউস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সেলিম নেওয়াজ বলেন, বছর তিনেক আগে মাঝারি মানের যে হোটেলকক্ষের ভাড়া ছিল ৮০০ টাকা, এখন তা ২ হাজার ২০০ থেকে আড়াই হাজার টাকা। তিন হাজার টাকার এসি কক্ষের ভাড়া এখন ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা। তারকা মানের হোটেলের কক্ষ ভাড়াও বাড়ানো হয়েছে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত।

কয়েক বছর ধরেই কক্সবাজার সৈকত ভাঙছে। সর্বশেষ গত জুলাই মাসে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট একাধিক নিম্নচাপের প্রভাবে জোয়ারের পানির উচ্চতা স্বাভাবিকের চেয়ে ৫ থেকে ৬ ফুট বেড়ে উপকূলে আঘাত হানে। তাতে লাবণী পয়েন্টের দুই কিলোমিটার সৈকত ভেঙে লন্ডভন্ড হয়ে যায়।

আবার টেকনাফ পর্যন্ত দীর্ঘ সৈকতে পর্যটকদের নামার সুযোগ থাকলেও পর্যাপ্ত ডুবুরি নিয়োগসহ নিরাপত্তা নিশ্চিতে সরকারি কোনো উদ্যোগ নেই। শহরের রাস্তাঘাটও ভাঙাচোরা। সন্ধ্যার পর পর্যটকদের বিনোদনের তেমন কোনো ব্যবস্থায় নেই। পর্যটকেরা সন্ধ্যার পর চুরি–ছিনতাইয়ের শিকার হলেও তা বন্ধে শক্ত পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না। আবার সৈকত এলাকায় গিয়ে নানা ধরনের উৎপাতের মুখে পড়তে হয় পর্যটকদের।

কলাতলী মেরিনড্রাইভ হোটেল রিসোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুকিম খান প্রথম আলোকে বলেন, কক্সবাজারে আগত পর্যটকদের নিরাপত্তা ও পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত না হওয়ার কারণে কেউ দুই-তিন দিনের বেশি থাকতে চান না।

সিলেটেও সুযোগ-সুবিধার অভাব

সিলেটে পর্যটন ব্যবসা দুই রকমের। একটি রিলিজিয়াস ট্যুরিজম বা ধর্মীয় পর্যটন, অন্যটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকেন্দ্রিক পর্যটন। ধর্ম ও ভ্রমণ উভয় কারণেই দেশ-বিদেশের পর্যটক ঘুরতে আসেন সিলেটে।

সিলেট অঞ্চলের জনপ্রিয় পর্যটন স্পটগুলো হচ্ছে সিলেটের গোয়াইনঘাটের রাতারগুল, বিছনাকান্দি, মায়াবী ঝরনা ও জাফলং; কোম্পানীগঞ্জের সাদা পাথর; কানাইঘাটের লোভাছড়া; ফেঞ্চুগঞ্জের হাকালুকি হাওর ও জৈন্তাপুরের লালাখাল। সুনামগঞ্জ জেলার টাঙ্গুয়ার হাওর, মৌলভীবাজারের চা-বাগান ও লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান এবং হবিগঞ্জের সাতছড়ি সংরক্ষিত বনাঞ্চলেও আসেন পর্যটকেরা। এই চার জেলায় এক হাজারের বেশি রিসোর্টসহ অসংখ্য হোটেল-মোটেল গড়ে উঠেছে। ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও দলবদ্ধ ভ্রমণ ও করপোরেট ট্যুর মিলিয়ে বছরে ২০ থেকে ২৫ লাখ পর্যটক আসেন।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশের পর্যটন-বাণিজ্যেও জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। পরিবহন ও খাবারের ব্যয় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ বেড়ে গেছে। এতে সিলেটে আগের তুলনায় পর্যটক সমাগম কমে প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। আবার যাঁরা আসছেন, তাঁরা পর্যাপ্ত সুযোগ–সুবিধা পাচ্ছেন না।

দর্শনীয় স্থানগুলোতে যাতায়াতের জন্য সড়ক ব্যবস্থা আগের চেয়ে উন্নত হয়েছে। তবে অধিকাংশ দর্শনীয় স্থানে নারী-শিশুদের জন্য উন্নতমানের শৌচাগার নেই। অধিকাংশ দর্শনীয় স্থানেই খাবারের ভালো রেস্তোরাঁ খুঁজে পাওয়া যায় না। নিরাপত্তারও সমস্যা আছে। পর্যটক লাঞ্ছিত হওয়ার ঘটনাও ঘটছে।

জানতে চাইলে সিলেট চেম্বারের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ফালাহ উদ্দিন আলী আহমদ বলেন, সিলেটে পর্যটনশিল্পের সম্ভাবনা থাকলেও পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নেই। সাদা পাথর ও বিছনাকান্দির নদীটি খনন করা দরকার। আবার সিলেট শহর থেকে বিছনাকান্দি যাওয়ার সড়কটি সরু। জাফলংয়ের পরিবেশ নোংরা। লালাখালে বালুর স্তর পড়ে পর্যটকবাহী নৌকা চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে পর্যটনশিল্পের ব্যবসায়ীরা এসব সমস্যা সমাধানে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি করলেও কোনো উন্নতি নেই। এতে পর্যটকেরা সিলেটবিমুখ হচ্ছেন।

এদিকে গত বছর বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ‘ট্যুরিজম স্যাটেলাইট অ্যাকাউন্ট’ শীর্ষক এক জরিপ করেছে। জরিপের তথ্য অনুযায়ী, দেশের জিডিপিতে পর্যটন খাতের অবদান ৩ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ। টাকার অঙ্কে যা ৮০ থেকে ৯০ হাজার কোটি টাকা।